ফ্রিল্যান্সিং কি ? কি কি বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং করে অনলাইন থেকে আয় করা যায়?

ফ্রিল্যান্সিং কি ?

আগে আমাদের জানতে হবে ফ্রিল্যান্সিং বলতে কি বুঝায়। ফ্রিল্যান্সিং (Freelancing) হলো স্বাধীন বা মুক্তপেশা। নির্দিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠানের অধীনে যুক্ত না থেকে নিজের কাজ নিজে স্বাধীনভাবে করা কে ফ্রিল্যান্সিং বলা হয়। এ ধরণের পেশায় যারা যুক্ত থাকে তাদের কে ফ্রীলেন্সার (Freelancer) বা স্বাধীনপেশাজীবি বলা হয়। এরা নির্দিষ্ট কোন প্রতিষ্ঠানের চাকরীজীবিদের মতো বেতনভুক্ত কর্মচারী নয়। এই পেশাই স্বাধীনতা আছে বিধায় ইচ্ছা মতো ইনকাম করার সুযোগ থাকে, তবে আয়ের পরিমাণটা কম বা বেশি নির্ভরকরে কাজের দক্ষতার উপর। যারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে সাচ্ছন্দবোধ করেন তাদের জন্য এই ফ্রিল্যান্সিং। বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট এতটাই প্রসারিত হয়েছে যে ঘরে বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং করা যায়। ফ্রিল্যান্সিং ইন্টারনেটভিত্তিক কাজ হওয়াতে এ পেশায় যুক্ত থেকে দেশি-বিদেশি হাজারো ক্লায়েন্টের সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকে। বাস্তব জীবনে কাজের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের প্রতারনার শিকার হতে হয়, ঠিক তেমনি ইন্টারনেটেও কাজ করতে গেলে প্রতারনার শিকার হতে হয়, সে বিষয়ে অবশ্যায় সতর্ক থেকে এগোতে হয়। একটি বিষয় মানতে হবে যে, অনলাইনে কাজ করে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার কোন সুযোগ নেই। বাস্তব জীবনে কাজের সফলতা আনতে হলে যেমন কাজের দক্ষতা, মেধা, শ্রম ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, তেমনি অনলাইনেও সফলতার জন্য একেই নিয়মে কাজ করে যেতে হয় এর ব্যতিক্রম হলে কোনভাবে সফলতা অর্জন করা যায়না। এটা স্বাধীনপেশা, যার কারণে ছাত্র- ছাত্রী এবং চাকুরীজীবি এই পেশায় যুক্ত হয়ে খণ্ডকালীন কাজ করে আয় করতে পারেন এবং পরবর্তিতে ফ্রিল্যান্সিং কে পেশা হিসাবে নিয়ে উজ্জল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। অনলাইন থেকে আয় করার অনেকগুলো মার্কেটপ্লেস ও রিসোর্স রয়েছে। আজকে আমি সেই বিষয় নিয়ে আলোচনা করব যা কাজে লাগিয়ে অনলাইনে থেকে আয় যায়।

কোন মার্কেটপ্লেসে ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করা যায় ?

ফ্রিল্যান্সারদের কাজের দক্ষতানুযায়ি কিছু ওয়েবসাইট ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। এসব সাইটের মধ্যে আপওয়ার্ক (upwork.com), ফাইভার (fiverr.com), ফ্রিল্যান্সার (freelancer.com), পিপল পার আওয়ার (peopleperhour.com), গুরু (guru.com), নাইনটি নাইন ডিজাইনস (99Designs.com), মাইক্রোওয়ার্কারস (microworkers.com), ও বিল্যান্সার (belancer.com) ফ্রিল্যান্সিং কাজ পাওয়া যায়। এই সব ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলে কাজের দক্ষতার বিবরন দিয়ে সুন্দর পোর্টফোলিও সহকারে একটা প্রোফাইল তৈরি করে নিতে হয়। এরপর কাজের ধরন ভালকরে বুঝে কাজ পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়। ক্লায়েন্ট ফ্রীলেন্সারের কর্ম দক্ষতা যাচাই করে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যোগাযোগ করে প্রতি ঘন্টা মূল্যে অথবা নির্দিষ্ট ডলার মূল্যে ফ্রিল্যান্সারকে কাজ প্রদান করেন। ক্লায়েন্ট কাজ সঠিকভাবে বুঝে পেলে তারপর চুক্তিনুযায়ি কাজের অর্থ পরিশোধ করে দেন। এখানে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, ক্লায়েন্টের কাজ যতক্ষন পর্যন্ত পছন্দ না হয় ততক্ষন পর্যন্ত কাজ করে দিতে হবে। কোন ভাবে বিরক্তবোধ করা যাবেনা ফ্রিল্যান্সারকে এবং কাজের মানের ওপর ভিত্তিকরে ক্লায়েন্ট রেটিং দেন এই ভাল রেটিং পরবর্তী কাজ পেতে অনেকটা সাহায্য করে। বিভিন্ন অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যম উপার্জিত অর্থ আনা যায়। ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে মাল্টি বিলিয়ন ডলারের একটা বিশাল বাজার। তাই এই পেশাই যুক্ত হয়ে বেকার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।

এবার আলোচনা করি কি উপায়ে অনলাইন থেকে আয় করা যায়। অনলাইন থেকে আয়ের বহু রিসোর্স রয়ছে। নিচে কয়েকটা রিসোর্স নিয়ে আলোচনা করা হলো।

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে আয়

অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং হলো অনলাইনে আয়ের অন্যতম জনপ্রিয় একটি মাধ্যম। এই মাধ্যমে কাজ করে ভাল আয় করা যায়। এই পদ্ধতিতে আয় করতে হলে নিজের ওয়েবপেজ বা ব্লগ প্রয়োজন হয়। এই ওয়েবপেজ বা ব্লগ ইন্টানেটে ফ্রি অথবা অর্থের বিনিময়ে তৈরি করা যায়। তবে নতুন অবস্থায় ফ্রি ব্লগ তৈরি করে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং শুরু করতে পারেন। এটি একটি বিপণন ব্যবস্থা, কোনো অ্যাফিলিয়েট নেটওয়ার্কের পণ্য বা সেবার রেফারেল লিংক ওয়েবপেজ বা ব্লগে প্রদর্শন করে পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে হয়। কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি হলে বিক্রেতা লাভের একটি অংশ কমিশন হিসেবে সেই অ্যাফিলিয়েট নেটওয়ার্করের অ্যাকাউন্টে দিয়ে থাকেন। পরবর্তিতে অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা যায়। ধৈর্যসহকারে সময় ও শ্রম দিলে অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং করে সফলতা অর্জন করা সম্ভব।

ওয়েব ডিজাইন করে আয়

বর্তমান সময়ে ছোট-বড় ব্যবসা, ইকমার্স ব্যবসা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পরিচিতি লাভের বা ব্যবসা প্রসারের জন্য একটা ওয়েবসাইটের প্রয়োজন হয়। সবাইতো আর ওয়েব ডিজাইনার না। নিজেদের ওয়েবসাইট তৈরিতে ওয়েব ডিজাইনারের দরকার হয়। ওয়েব ডিজাইন করে মাসে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সহজে আয় করা যায়। অনলাইনের কাজের ক্ষেত্রে ওয়েব ডিজাইনের চাহিদা ব্যাপক। নিজের তৈরি করা ডিজাইন অনলাইনের মাধ্যমে বিক্রি করে প্রচুর অর্থ আয় করা যায়। অনলাইনে ওয়েব ডিজাইন বিক্রি করার জন্য অনেক প্লাটফর্ম রয়েছে তবে থিম ফরেস্ট হলো খুব জনপ্রিয় প্লাটফর্ম। বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে ওয়েব ডিজাইনের প্রচুর কাজ রয়েছে। সেখান থেকে কাজ সংগ্রহ করে আয় করা যায়। নিজেই ওয়েব ডিজাইনের ব্যবসা করতে চাইলে একটি ওয়েবসাইট খুলে সেখান নিজের করা ডিজাইনগুলো প্রদর্শন করে বিক্রি করতে পারেন। এ ছাড়া ওয়েবসাইটগুলো প্রতিনিয়ত হালনাগাদের প্রয়োজন হয়, তাই ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপনা ও হালনাগাদের জন্যও ওয়েব ডিজাইনারকে দরকার হয়। ফলে ডিজাইনারকে বসে থাকতে হয় না।

গ্রাফিকস ডিজাইন করে আয়

অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতেও গ্রাফিকস ডিজাইনারদের অনেক চাহিদা রয়েছে। একজন দক্ষ গ্রাফিকস ডিজাইনার অনলাইনের মাধ্যমে ঘরে বসে গ্রাফিকস ডিজাইনের কাজ করে স্বাধীনভাবে প্রচুর অর্থ আয় করতে পারেন। যারা এই কাজে দক্ষ, তাদের করা বিভিন্ন ডিজাইন অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতে দিয়ে রাখেন। সেই ডিজাইন বিক্রির মাধ্যমে সেখান থেকে তাদের আয় আসে। তাদের তৈরি একটি ডিজাইন অনেকবার বিক্রি হয়, তাই একটা ডিজাইন থেকেই দীর্ঘদিন পর্যন্ত আয় আসে।

গুগল অ্যাডসেন্স এর মাধ্যমে আয়

ওয়েবসাইট বা ব্লগ তৈরির করে সেখানে গুগলের বিজ্ঞাপন প্রদর্শন করে আয় করা যায়। একটি ওয়েবসাইট বা ব্লগে বিভিন্ন বিষয়ে ভাল মানের লেখা যখন পাঠক বা দর্শক পড়ে ভালো লাগে, সেই ওয়েবসাইট বা ব্লগে প্রচুর ভিজিটর থাকে তখন গুগল অ্যাডসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়। আবেদন গৃহীত হলে গুগলের বিজ্ঞাপন সাইটে প্রদর্শন হয় এবং তাতে ক্লিক পড়লে, তখন সেখান থেকে আয় আসতে শুরু করে। ওয়েবসাইটে ট্রাফিক বা দর্শক যত বেশি হবে, আয়ের পরিমাণ তত বাড়বে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আয়

ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট, লিঙ্কডিন, পিন্টারেস্ট, গুগল প্লাস, ইউটিউব সহ এরকম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাইটগুলো ব্যবহার করে আয় করা যায়। এইসব সাইটে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া প্রতিদিন লাইক, কমেন্টস, শেয়ার, ছবি ও ভিডিও পোষ্ট করে অনেক সময় ব্যয় করা হয়। কিন্তু এই কাজগুলো আয়ের কৌশল হিসাবে সঠিক নিয়মে ধৈর্য ধরে ব্যবহার করতে পারলে এখান থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জন করা যায়।

কনটেন্ট রাইটিং করে আয়

লেখালেখি করে অনলাইন থেকে টাকা আয় করা যায়। অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতে কনটেন্ট রাইটিং এর প্রচুর কাজ থাকে। যারা লিখতে ভালোবাসেন এবং একাধিক ভাষায় সাবলীল লিখতে পারেন, তারা মার্কেটপ্লেসগুলোতে কনটেন্ট রাইটিং এক কাজ করে আয় করতে পারেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্লগে আর্টিকেল অথবা প্রোডাক্ট রিভিউ লিখে আয় করা যায়।

ডেটা এন্ট্রির কাজ করে আয়

অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোতে ডেটা এন্ট্রির অনেক কাজ থাকে। দ্রুতগতির টাইপিং দক্ষতা থাকলে ডেটা এন্ট্রির কাজ করে অনলাইন থেকে আয় করা যায়। এই কাজগুলো অনেকটা সহজ তাই আয়টাও খুব কম। তবে দক্ষতার দ্বারা পরিশ্রম ও ধৈর্যসহকারে কাজটা নিয়মিত করতে পারলে এখান থেকে ভালো আয় আসে।

অনুবাদ করে আয়

অনেক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সময়ের অভাবে তাদের অনুবাদের কাজগুলো ফ্রিল্যান্সারদের দিয়ে করিয়ে নেন। তাই অনলাইনে আরবি, স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মানসহ অন্যান্য ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ এবং ইংরেজি থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের অনেক কাজ পাওয়া যায়। ইংরেজির পাশাপাশি অন্য কোনো ভাষা ভালোভাবে জানা থাকলে সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে অনলাইন থেকে আয় করা যায়।

Leave a Reply